মিশরের জন্য জামদানী: একটি স্বপ্নের বাস্তবায়ন
EGYPT - February 2025 | By Joya
একটু আগেই সূর্যটা ধীরে ধীরে পিরামিডের গা ঘেঁষে বিদায় নিলো। সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। এখনো নিজের চোখকে বিশ্বাস করাতে পারছি না, আমি পৃথিবীর প্রাচীনতম বিস্ময়গুলোর মধ্যে অন্যতম একটির এতটা কাছে বসে আছি। মিশর নিয়ে আমার আগ্রহ বহু পুরনো, কিন্তু আজকের গল্পটি মিশরের নয়, মিশরের জন্য তৈরি করা একটি জামদানীকে ঘিরে।
একটি ভাবনা, একটি কল্পনা যখন বাস্তবে রূপ পায় সেই আনন্দ সত্যিই বর্ণনাতীত। আর যদি সেই স্বপ্নপূরণে পাশে কাউকে পাওয়া যায়, তাহলে তা আর শুধু একার স্বপ্ন থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে সবার। আমি চেয়েছিলাম, মিশরে গেলে একটি বিশেষ জামদানী পরবো যেটিতে থাকবে প্রাচীন মিশরের Hieroglyphics। আমার জানা মতে, এই পর্যন্ত এমন কোনো জামদানী এখনো তৈরী হয়নি।
এই ভাবনা নিয়ে মিশর যাওয়ার ২০ দিন আগে আমি যোগাযোগ করলাম “পালং খ্যিয়ং” পেজের স্বত্বাধিকারী ডঃ জিনিয়া রহমান আপুর সঙ্গে। তিনি সবসময়ই ব্যতিক্রম কিছুতে আগ্রহী। আমার আইডিয়াটি শুনেই আপু উৎসাহ দিলেন এবং বললেন, আমি যেন ডিজাইন করি, তিনি তাঁতীর ব্যবস্থা করবেন।
তখন থেকেই শুরু হলো আমার প্রাচীন মিশরীয় প্রতীকের ওপর গবেষণা। শুধু নকশা নয়, প্রতীকগুলোর মানেও জানতে চেয়েছিলাম। যেহেতু শাড়ীটি জন্মদিনে পরবো বলে ঠিক করেছিলাম, ঐ ভাবনাটা মাথায় রেখেই শাড়ীর জন্য বেছে নিলাম —𓋹 Ankh (আঙ্ক), যা অনন্ত জীবনকে বোঝায়, এবং 𓂀 Eye of Horus (হোরাসের চোখ), যা সুরক্ষা, সুস্বাস্থ্য ও পুনরুদ্ধারের প্রতীক। এই দুটি প্রতীক শাড়ীর পাড়ের জন্য রাখলাম।
তারপর আঁচলের নকশা কেমন হবে তা নিয়ে ভাবতে ভাবতে ইন্টারনেট ঘেঁটে নানা রকম আইডিয়া সংগ্রহ করলাম। তারপর শুরু হলো সবকিছু একত্র করার কাজ, একটি সাদা কাগজের উপর ফুটে উঠতে লাগল এক আধ্যাত্মিক কল্পনার জগত।
পাড়ের তুলনায় আঁচলের নকশা ছিল আরও গভীর, আরও জটিল। আঁচলের কেন্দ্রবিন্দুতে জায়গা করে নিল একটি পিরামিড, যার মধ্যে একটিমাত্র চোখ। এটি “সর্বদর্শী চোখ” বলা হয় যা জ্ঞান, ঈশ্বরের উপস্থিতি এবং অন্তর্দৃষ্টির চিরন্তন প্রতিচ্ছবি।
চোখের ঠিক ওপরে স্থান পেয়েছে আঙ্ক: জীবনের প্রতীক, মিশরীয় পুরাণে যা অমরত্বের প্রতিনিধিত্ব করে। এই প্রতীকটি প্রায়শই মিশরীয় দেবতাদের হাতে দেখা যায় মহাশক্তি ও সত্তার ধারকরূপে।
আঙ্কের উপরে উদিত এক সূর্য, যার চারপাশ ঘিরে আছে কক্ষপথ যেন পুরো মহাবিশ্বের প্রাণশক্তি একসূত্রে বাঁধা। সূর্যটি শুধু আলো নয়, বরং মিশরীয় সূর্যদেবতা “রা”-এর মহাজাগতিক উপস্থিতিরও ইঙ্গিত বহন করে।
চোখ থেকে নেমে আসা রশ্মির মতো রেখাগুলো ঐশ্বরিক আলোর প্রবাহ যা কিনা জগতজোড়া জ্ঞান, শক্তি ও আশীর্বাদের প্রতীক হয়ে আঁচলের ডিজাইনকে আরো অর্থবহ করে তুলেছে। সব মিলিয়ে আঁচলের নকশাটি আধ্যাত্মিক অন্তর্দৃষ্টি, ঐশ্বরিক শক্তি এবং মহাজাগতিক সংযোগের এক প্রতিচ্ছবি।
সবকিছু একসাথে করে আপুকে ছবি তুলে পাঠিয়ে দিলাম। সেই দিন সম্ভবত আপুর একটি স্টাডি ট্যুর ছিল। তবুও ব্যস্ততার মাঝেও আপু থেমে থাকেননি। তিনি ঐ ছবি পাঠিয়ে দেন বিভিন্ন তাঁতীদের কাছে এবং যোগাযোগ শুরু করেন একে একে। কিন্তু সময় ছিল খুবই অল্প, তাই আমার মনে ভর করে নানান দুশ্চিন্তা: সম্ভব হবে কি না, কোনো তাঁতী রাজি হবেন কিনা, এতো অল্প সময়ে কাজটা আদৌ করা যাবে তো?
একজন তাঁতী জানালেন, যদি ডিজাইনটা কোনো শাড়ীতে থাকত, তাহলে সেটা দেখে দেখে নিমিষেই করা যেত। কিন্তু কম্পিউটারের স্ক্রিন থেকে দেখে এত জটিল কাজ স্বল্পসময়ে করা সম্ভব নয়। মনটা একটু ভেঙে পড়েছিল। কিন্তু জিনিয়া আপু দমে যাওয়ার মানুষ নন, স্টাডি ট্যুর এ যাওয়ার পথেই বাসে বসে বসে তিনি খুঁজে বের করলেন সেই সাহসী তাঁতী, যিনি বললেন, “অবশ্যই হবে, ২ সপ্তাহের মধ্যেই হবে।”
তাঁতের খুঁটিনাটি ঠিক করার পরে শুরু হলো বুননের কাজ। সময় যেহেতু কম ছিলো তাই যদি শাড়ীটির কাজ শেষ করে সময়মতো পৌঁছানো না যায়, তাহলে মিশরে পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থাও করে রেখেছিলেন আপু। ভাগ্যক্রমে, কাজ শেষ হলো নির্ধারিত সময়ের এক দিন আগেই। তাঁতী জামদানীটি তৈরি করেই ছুটলেন DHL-এ, আর আপু নিজেও ছুটে গিয়ে সেটি হাতে নিলেন, গায়ে জড়িয়ে ছবি তুলে পাঠালেন আমাকে।
“পালং খ্যিয়ং” পেজের স্বত্বাধিকারী ডঃ জিনিয়া রহমান
https://www.facebook.com/palongkhiyang/
ছবিগুলো দেখে আমি বাকরুদ্ধ। পাড়ের প্রতীকগুলো যদিও উল্টো বোনা হয়েছে, কিন্তু তাতে কারুকার্যের সৌন্দর্য এতটুকুও কমেনি। আমি মুগ্ধ। অল্প সময়ে, এমন নিখুঁত শিল্পকর্ম! এটা বাংলাদেশী তাঁতীদের গৌরব। যদি তারা আরও সুযোগ-সুবিধা পেতেন, তাহলে আরোও কতো কি যে করতে পারতেন!
জামদানীটি হাতে পেয়ে মনে পড়ে গেলো Paulo Coelho এর The Alchemist বইয়ের বিখ্যাত সেই উক্তি:
“And, when you want something, all the universe conspires in helping you to achieve it.”
কী আশ্চর্য রকম সত্যিই তো! যখন কোনো কিছু মনপ্রাণ ঢেলে ভালোবাসা নিয়ে করা যায়, তখন যেন গোটা বিশ্বই তার বাস্তবায়নে সহায় হয়ে ওঠে। এই যে, আমার স্বপ্নটা যেন সত্যি হয়, তার জন্য চারপাশের মানুষদের একাগ্রতা, নিরন্তর চেষ্টা এসব দেখে নিজের প্রতি, নিজের ভাগ্যের প্রতি এক অপার্থিব কৃতজ্ঞতায় ভরে উঠেছে মন।
সবচেয়ে বিস্ময়ের বিষয় হলো, যাকে কোনোদিন সামনে থেকে দেখা হয়নি, শুধুমাত্র ‘পালং খ্যিয়ং’ পেইজের মাধ্যমে যার সঙ্গে আমার পরিচয় সে-ই মানুষটি হয়ে উঠেছে আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যিনি মমতায় ভরিয়ে দিয়েছেন আমাকে, এমনভাবে স্নেহের পরশ ছুঁয়ে দিয়েছেন, যা আমি জীবনে অনেক আপনজনের কাছ থেকেও কখনো পাইনি। এমন নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, এমন অকুণ্ঠ মমতা! এসব পেলে যে নিজেকে কতটা ভাগ্যবতী বলে মনে হয়, তা ভাষায় প্রকাশ করা সত্যিই কঠিন।
পহেলা ফেব্রুয়ারি, আমার জন্মদিনে, আমি যখন জামদানীটি পরে দ্য গ্রেট পিরামিডের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম, আর আমার জীবনসঙ্গী যখন সেই মুহূর্তগুলো ক্যামেরাবন্দি করছিলেন ঐ মুহূর্তে যে আনন্দ আমার হচ্ছিলো তা অন্য কিছুর সাথে অতুলনীয়। আরোও ভালো লাগছিলো যখন আশেপাশের মানুষ শাড়ীর প্রশংসা করছিল, শাড়ী সম্পর্কে জানতে চাচ্ছিলো এবং সাথে ছবি তুলেও নিয়ে যাচ্ছিলো। এই মুহূর্তগুলো আমার জীবনের অমূল্য স্মৃতি হয়ে থাকবে।
মনের সব কথা সবসময় বলে কিংবা লিখে প্রকাশ করা কঠিন। আমি কৃতজ্ঞ - জিনিয়া আপুর প্রতি, সেই শিল্পী তাঁতীর প্রতি, এবং এই স্বপ্নের পথচলায় জড়িয়ে পড়া সব মানুষের প্রতি। তাঁদেরকে পাশে না পেলে হয়তো এ স্বপ্ন কেবলই কল্পনায় থেকে যেতো, বাস্তবে আর রুপ দেয়া হতো না।
ধন্যবাদ—এই শব্দটি যথেষ্ট নয়, তবুও বারবার বলতে ইচ্ছে করে: অসংখ্য ধন্যবাদ।

